আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পবিত্র রমজানের প্রথম জুমার নামাজ আদায়ে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসরায়েল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ফিলিস্তিনিকে বিশেষ অনুমতিপত্রের ভিত্তিতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে—যা আগের বছরগুলোর তুলনায় নগণ্য।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ভোর থেকেই রামাল্লাহর কাছে কালান্দিয়া চেকপয়েন্টে শত শত মানুষ জড়ো হন। তারা আল-আকসায় প্রবেশের আশায় দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করেন। তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানায়, নির্ধারিত কোটার বাইরে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২–এর খবরে বলা হয়েছে, সকাল পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি কালান্দিয়া চেকপয়েন্ট অতিক্রম করে জেরুজালেমের দিকে যেতে পেরেছেন। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের মধ্যবর্তী চেকপয়েন্টগুলোতে উচ্চ সতর্কতায় মোতায়েন রয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।
নতুন বিধিনিষেধ অনুযায়ী, ১২ বছরের কম বয়সী শিশু, ৫৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষ এবং ৫০ বছরের বেশি বয়সী নারীরাই কেবল প্রবেশের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদক নূর ওদেহ কালান্দিয়া চেকপয়েন্ট থেকে জানান, “অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ বাস করেন। সেখানে প্রথম জুমায় মাত্র ১০ হাজার মানুষকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া সমুদ্রের তুলনায় এক ফোঁটা পানির মতো। এখন পর্যন্ত খুব অল্পসংখ্যক মানুষই প্রবেশ করতে পেরেছেন।”
তিনি বলেন, “আগের বছরগুলোতে এই পবিত্র স্থানে আড়াই লাখ পর্যন্ত মুসল্লির উপস্থিতি দেখা গেছে। এবার সেই সংখ্যার সামান্য অংশ উপস্থিত থাকতে পারবেন। তারা হবেন পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসরত ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্য থেকে।”
সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, পশ্চিম তীর থেকে আল-আকসায় প্রবেশের নির্ধারিত কোটাও পূর্ণ হয়ে গেছে বলে দাবি করছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।
নূর ওদেহ বলেন, “আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের বহু প্রজন্মের ঐতিহ্যের অংশ। সেখানে দিন কাটানো এবং ইফতার করা তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু এ বছর অনেকেই জেরুজালেমে গিয়ে রোজা ভাঙতে পারবেন না। এর মাধ্যমে পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের মধ্যকার সম্পর্ক আরও বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।”
পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধি
নতুন এই বিধিনিষেধ এমন এক সময়ে আরোপ করা হলো, যখন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ, মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বসতি স্থাপনকারীরা ইসরায়েলি বাহিনীর সমর্থন বা উপস্থিতিতে ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের ওপর গুলি চালানো, বাড়িঘর ও কৃষিজমিতে অগ্নিসংযোগ এবং জমি দখলের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
বুধবার পশ্চিম তীরের একটি গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের গুলিতে এক তরুণ ফিলিস্তিনি-আমেরিকান নিহত হন এবং আরও চারজন আহত হন।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
এর আগে চলতি সপ্তাহে ইসরায়েল সরকার পশ্চিম তীরের বিস্তীর্ণ এলাকাকে ‘রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি’ হিসেবে ঘোষণার একটি পরিকল্পনা অনুমোদন দেয়, যা কার্যত সংযুক্তিকরণের (ডি ফ্যাক্টো অ্যানেক্সেশন) পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে জমির মালিকানা প্রমাণের দায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপানো হয়েছে—যেখানে দীর্ঘদিন ধরেই মালিকানা সনদ সংগ্রহ প্রায় অসম্ভব বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের ৮০টিরও বেশি সদস্য রাষ্ট্র পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বৃহৎ অংশ দাবি করার পরিকল্পনার নিন্দা জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভূমি দখল ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পরিপন্থী এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে আরও ক্ষীণ করে দিচ্ছে। আল জাজিরা
রিপোর্টার্স২৪/এসসি