স্টাফ রিপোর্টার: বাতাসে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা—কারা যে ডাকিল পিছে! বসন্ত এসে গেছে...’—কবিগুরুর এ সুর যেন আজ আরও প্রাসঙ্গিক। আজ পয়লা ফাল্গুন (১৪ ফেব্রুয়ারি)। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন এবং বাংলা সনের একাদশ মাসের সূচনা।
বসন্ত মানেই পূর্ণতা, নবজাগরণ ও প্রাণের উচ্ছ্বাস। ফাল্গুনের প্রথম দিনটি বাংলাদেশে পয়লা ফাল্গুন ও বসন্ত বরণ উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়। ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ-এর উদ্যোগে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বসন্ত বরণের আয়োজন করা হয়। এরপর থেকে দিনটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারের অন্যতম উজ্জ্বল অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।
একই দিনে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ভালোবাসা দিবসও। ফলে বসন্ত ও ভালোবাসা—দুটি আবেগ মিলেমিশে তৈরি করে বিশেষ এক আবহ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তরুণ-তরুণীরা হলুদ, বাসন্তী, লাল ও কমলা রঙের পোশাকে সেজে বসন্তকে বরণ করছেন। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর আয়োজনে রয়েছে গান, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্যানুষ্ঠান।
শীতের রুক্ষতা পেছনে ফেলে প্রকৃতিকে নতুন সাজে সাজিয়ে তোলে বসন্ত। গাছে গাছে কচি পাতা, ফুলের মুকুল আর পাখির কলতান জানান দেয় ঋতুরাজের আগমনী বার্তা। বাতাসে ভাসে ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ, প্রজাপতির রঙিন ডানায় ধরা পড়ে প্রকৃতির উচ্ছ্বাস। বসন্ত কেবল প্রকৃতিতে নয়, মানুষের মনেও জাগায় নতুন প্রাণের সঞ্চার।
‘ফাল্গুন’ নামটির উৎস ফাল্গুনী নক্ষত্র। প্রাচীনকালে চন্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষ উভয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো, তখন ফাল্গুন ছিল পূর্ণ চন্দ্রের মাস। পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে পয়লা ফাল্গুন উদযাপনের প্রচলন শুরু হয়। পাকিস্তানি শাসনামলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় বাঙালিরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া ও বসন্ত বরণের মধ্য দিয়ে নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরতে শুরু করে।
বসন্ত নিয়ে বাংলা সাহিত্য-সংগীতে রয়েছে সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘ফুল ফুটুক, আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত’। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম-এর কণ্ঠে ‘বসন্ত বাতাসে সই গো’ গানটি আজও সমান জনপ্রিয়। আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর অসংখ্য কবিতা ও গানে বসন্ত এসেছে প্রেম, প্রকৃতি ও নবজাগরণের প্রতীক হয়ে।
তবে বসন্ত শুধু রঙ ও রোমাঞ্চের নয়, এ মাসের রয়েছে গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্যও। ফাগুনের শিমুল-কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙ মনে করিয়ে দেয় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগ। মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে জীবন দিয়েছিলেন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বাররা। তাঁদের রক্তের পথ বেয়ে এসেছে স্বাধীনতার সূর্যোদয়।
তাই ফাল্গুন বাঙালির কাছে যেমন প্রেম ও সৌন্দর্যের মাস, তেমনি দ্রোহ ও আত্মত্যাগেরও স্মারক। বসন্তের এই প্রথম দিনে প্রকৃতি আর ইতিহাস—দুই মিলেই নতুন প্রত্যয়ের বার্তা দেয় জাতিকে।