আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সংঘাত এড়াতে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে যোগাযোগ শুরু করেছে বলে নিশ্চিত করেছে দুই দেশ। উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়তে থাকা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের মধ্যেই এই অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলল।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, ইরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে “সিরিয়াসলি কথা বলছে।” এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি জানান, আলোচনার জন্য একটি কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন ইরানের উচিত এমন একটি চুক্তিতে সম্মত হওয়া, যেখানে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। তবে তেহরান সেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন বলে জানান।
ট্রাম্প বলেন, তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলছে। সত্যিই সিরিয়াসভাবে কথা বলছে।
এ সময় তিনি ইরানের দিকে অগ্রসরমান মার্কিন নৌবহরের কথাও উল্লেখ করেন। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীর নেতৃত্বে এই বহরকে তিনি খুব বড় ও শক্তিশালী বলে বর্ণনা করেন।তিনি বলেন, আমি আশা করি তারা এমন কিছু নিয়ে আলোচনা করবে, যা গ্রহণযোগ্য হবে।
এর আগে শনিবারই ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান।
তিনি লেখেন, কৃত্রিমভাবে তৈরি করা মিডিয়া যুদ্ধের বর্ণনার বিপরীতে, আলোচনার জন্য একটি কাঠামো গঠনের কাজ এগিয়ে চলছে।তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইরানে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার প্রশ্নে ট্রাম্প একাধিকবার সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প বলেন, ইরানের দিকে পাঠানো মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো প্রয়োজনে সহিংসতা ব্যবহার করতে প্রস্তুত, যদি তেহরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানায়।
এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) শুক্রবার হরমুজ প্রণালিতে দুই দিনের নৌ-মহড়ার পরিকল্পনা নিয়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) সতর্ক করে। হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক পথ।
এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, মার্কিন বাহিনী, আঞ্চলিক অংশীদার কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজের কাছাকাছি কোনো অনিরাপদ ও অপেশাদার আচরণ সংঘর্ষ, উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
ইরানের শীর্ষ নেতারা বলছেন, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে আগ্রহী, তবে তার আগে ট্রাম্পকে সামরিক হামলার হুমকি বন্ধ করতে হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শনিবার এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থান নেওয়া মার্কিন সেনাবাহিনী এখন আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী কীভাবে নিজেদের ভূখণ্ডে লক্ষ্যভেদ অনুশীলন করবে, তা নির্ধারণ করতে চাইছে।
তিনি লেখেন, একই সঙ্গে সেন্টকম ‘পেশাদারিত্ব’ দাবি করছে এমন একটি জাতীয় বাহিনীর কাছ থেকে, যাকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে আবার সেই ‘সন্ত্রাসী সংগঠনকেই’ সামরিক মহড়া চালানোর অধিকারও স্বীকার করছে!
উল্লেখ্য, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আইআরজিসিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে।
আরাঘচি আরও বলেন, আমাদের অঞ্চলে বাইরের শক্তির উপস্থিতি সবসময় ঘোষিত উদ্দেশ্যের ঠিক বিপরীত ফল বয়ে এনেছে উত্তেজনা কমানোর বদলে বাড়িয়ে তুলেছে।
আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি জানান, পরিস্থিতি এখনো খুবই ভঙ্গুর ও সংবেদনশীল।তবে তিনি বলেন, আলোচনার কাঠামো অগ্রগতির বিষয়ে লারিজানির বক্তব্য একটি ইতিবাচক সংকেত।
আসাদি বলেন, কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
এদিকে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জাসিম আল থানি শনিবার তেহরানে আলি লারিজানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়।
এক বিবৃতিতে কাতার জানায়, শেখ মোহাম্মদ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে সব ধরনের উদ্যোগে দোহার সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, উত্তেজনা বাড়লে এর ভয়াবহ পরিণতি থেকে অঞ্চলবাসীকে রক্ষা করতে সমন্বিত উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।
এ ছাড়া তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত এড়াতে সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে।
ন্যাটো সদস্য তুরস্ক ইরানের প্রতিবেশী দেশ এবং সেখানে কোনো বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে। আঙ্কারা যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংলাপের আহ্বান জানিয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
অন্যদিকে সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মঙ্গলবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনালাপে বলেন, তেহরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে সৌদি আরব তার আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না। আল জাজিরা
রিপোর্টার্স২৪/এসসি