স্টাফ রিপোর্টার: সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তুলতে সারাদেশে সর্বমোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। একই সঙ্গে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে নির্বাচনপূর্ববর্তী চার দিন নিবিড় টহল পরিচালনার পাশাপাশি চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভা শেষে এসব কথা বলেন তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে দুই পর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হবে। এ ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা থেকে শুরু করে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স পরিচালনাসহ সবকিছুর সমন্বয় থাকবে রিটার্নিং কর্মকর্তার অধীনে। গত ৬ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও ভিডিপি, কোস্ট গার্ডসহ স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দিতে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। প্রথম পর্বে যারা বর্তমানে মোতায়েন রয়েছেন, তারা বহাল থাকবেন।
দ্বিতীয় পর্বে ভোটকেন্দ্রিক মোতায়েন করা হবে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট সাত দিন দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশ ও আনসার-ভিডিপির পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও র্যাবের সমন্বয়ে একটি আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল গঠন করা হবে। এ সমন্বয় সেলে প্রতিটি বাহিনীর একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর জাতীয় নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সার্বক্ষণিক সেবা প্রদানের জন্য জরুরি পরিষেবা নম্বর ৯৯৯-এ বিশেষ টিম গঠন করে আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। এ টিম প্রাপ্ত অভিযোগ বা তথ্যের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এলাকাভিত্তিক আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলে তথ্য পাঠাবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থাপিত আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা সংবেদনশীলতা বিবেচনায় পুলিশ ও আনসার-ভিডিপির পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও র্যাব মোতায়েন করা হবে।
এছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান এবং চেকপোস্ট ও তল্লাশিচৌকি কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এবারের জাতীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো বা নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে সর্বমোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য মোতায়েন করা হবে।
এর মধ্যে রয়েছে-বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১ লাখ, নৌবাহিনী ৫ হাজার, বিমান বাহিনী ৩ হাজার ৭৩০ জন (এর মধ্যে স্থলভাগে ১ হাজার ২৫০), বাংলাদেশ পুলিশ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্ট গার্ড ৩ হাজার ৫৮৫, র্যাব ৭ হাজার ৭০০ এবং সহায়ক বাহিনী হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ১৩ হাজার ৩৯০ জন।
তিনি বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ৮ হাজার ৭৮০টি, গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ১৬ হাজার ৫৪৮টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ১৭ হাজার ৪৩৩টি। অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে ২৫ হাজার বডি অন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বাচনী প্রশিক্ষণ আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন হবে। নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এ ধরনের প্রশিক্ষণ এবারই প্রথম আয়োজন করা হয়েছে।
ডেভিল হান্ট ফেজ-২ অভিযানের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, চলমান অভিযানে গত ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৯ হাজার ৮৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে ৩৪৬টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২ হাজার ১৯১ রাউন্ড গুলি, ৭২২ রাউন্ড কার্তুজ, ৬৯৪টি দেশীয় অস্ত্র, গ্রেনেড, মর্টারের গোলা, গান পাউডার, আতশবাজি, বোমা তৈরির উপকরণসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় মামলা ও ওয়ারেন্টভিত্তিক গ্রেপ্তারসহ মোট ৫৩ হাজার ৩৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডেভিল হান্ট ফেজ-২-এর অংশ হিসেবে চেকপোস্ট ও টহলের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, যাতে সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীরা পালাতে না পারে এবং অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার আরও জোরদার করা যায়।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব